দেশের খবর
ওপেন-হার্ট সার্জারি ছাড়াই হৃদরোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী সাফল্য, মণিপাল হাসপাতালে MyCLIP TEER প্রতিস্থাপন
ওপেন-হার্ট সার্জারি ছাড়াই গুরুতর হৃদরোগের চিকিৎসায় পূর্ব ভারতে প্রথমবার MyCLIP TEER প্রতিস্থাপন করে নজির গড়ল মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস।
উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসায় (Advanced Heart Treatment) এক ঐতিহাসিক অধ্যায় যুক্ত হল পূর্ব ভারতের চিকিৎসাক্ষেত্রে। মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস (Manipal Hospital, EM Bypass) প্রথমবারের মতো সফলভাবে প্রতিস্থাপন করল MyCLIP TEER, যা ওপেন-হার্ট সার্জারি (Open Heart Surgery) ছাড়াই গুরুতর হৃদরোগের সমাধান সম্ভব করল।
২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর আসানসোলের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সি রামস্বারূপের শরীরে এই অত্যাধুনিক যন্ত্রটি সফলভাবে বসানো হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই জটিল ছিল যে ওপেন-হার্ট সার্জারি করানো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতিতে মিনিমালি ইনভেসিভ (Minimally Invasive) এই চিকিৎসা পদ্ধতি তাঁর জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালায়।
এই জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেন মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস-এর ডিরেক্টর ক্যাথ ল্যাব ও সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডা. দিলীপ কুমার (Senior Interventional Cardiologist Dilip Kumar)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডা. প্রকাশ কুমার হাজরা (Director & Head of Cardiology, Manipal Hospital Dhakuria), ডা. রবিন চক্রবর্তী (Senior Consultant, Cardiology) এবং ডা. অনিল কুমার সিংঘি (Senior Consultant, Pediatric Cardiology)। একাধিক বিভাগের চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এই চিকিৎসা সাফল্য সম্ভব হয়েছে।
রামস্বারূপ ভুগছিলেন গুরুতর মাইট্রাল রিগারজিটেশন (Mitral Regurgitation)-এ, যেখানে হৃদযন্ত্রের ভালভ ঠিকমতো বন্ধ না হওয়ায় রক্ত উল্টো দিকে ফিরে আসে। এর ফলে হৃদপিণ্ডকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। পাশাপাশি তাঁর ছিল ডাইলেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি (Dilated Cardiomyopathy), যার ফলে হৃদযন্ত্র বড় ও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁর LVEF ছিল মাত্র ২৫ শতাংশ। এছাড়াও পালমোনারি হাইপারটেনশন (Pulmonary Hypertension), সামান্য করোনারি আর্টারি ডিজিজ (Coronary Artery Disease) ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও ছিল।
এর আগে গুরুতর অ্যানাসার্কা (Anasarca) ও হার্ট ফেইলিওর (Heart Failure) নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এই সব কারণেই ওপেন-হার্ট সার্জারি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে MyCLIP TEER পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়।
দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই যন্ত্রটির মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ভালভের ত্রুটি সংশোধন করে রক্তের উল্টো প্রবাহ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়। রামস্বারূপের ক্ষেত্রে MyCLIP (LW-12/6) সফলভাবে প্রতিস্থাপনের পর শ্বাসকষ্ট ও বুকের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ঘুমের সমস্যাও দূর হয়। মাত্র দু’দিনের মধ্যেই তাঁকে স্থিতিশীল অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান।
চিকিৎসা খরচের দিক থেকেও এই ঘটনা এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। আগে বিশ্বজুড়ে মাত্র দু’টি সংস্থা MyCLIP TEER তৈরি করত, ফলে খরচ দাঁড়াত প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। বর্তমানে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (Make in India) উদ্যোগে ভারতের ‘মেরিল’ (Meril) সংস্থা এই যন্ত্র তৈরি করায় খরচ কমে হয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা।
এছাড়া কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR)-এর অংশ হিসেবে সংস্থাটি যন্ত্রের খরচ আরও ৫০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেয়। মণিপাল ফাউন্ডেশন ও একটি সামাজিক সংস্থার সহায়তায় নিশ্চিত করা হয়, যাতে রোগীর উপর কোনও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়ে।
এই সাফল্য প্রসঙ্গে ডা. দিলীপ কুমার বলেন,
“গুরুতর মাইট্রাল রিগারজিটেশন রোগীর জীবনযাত্রার মান ও আয়ু দু’টিকেই মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। রামস্বারূপের ক্ষেত্রে ওপেন-হার্ট সার্জারি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। MyCLIP TEER একটি নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প হিসেবে তাঁকে নতুন জীবন দিয়েছে।”
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে রামস্বারূপ বলেন,
“চিকিৎসার আগে প্রতিটি শ্বাস নেওয়াই ছিল যুদ্ধের মতো। এখন স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছি, শান্তিতে ঘুমোতে পারছি। মণিপাল হাসপাতাল আমাকে জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে।”
এই সাফল্য শুধু পূর্ব ভারতের চিকিৎসাক্ষেত্রেই নয়, বরং দেশীয় চিকিৎসা প্রযুক্তি কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকল।
