পৌষমেলার টানে শান্তিনিকেতনে জনজোয়ার: ফিরে দেখা মহর্ষি ও রবীন্দ্রনাথের সেই পুরনো দিনগুলো
Connect with us

বাংলার খবর

পৌষমেলার টানে শান্তিনিকেতনে জনজোয়ার: ফিরে দেখা মহর্ষি ও রবীন্দ্রনাথের সেই পুরনো দিনগুলো

১৮৪৫ সালে শুরু হওয়া এক ছোট মেলা কীভাবে আজ বিশ্বভারতীর প্রাণস্পন্দন হয়ে উঠল? পৌষমেলার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের চিঠি আর পুরনো দিনের স্মৃতিমাখা এক প্রতিবেদন।

Joy Chakraborty

Published

on

শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা

শীতের মিঠে রোদ আর লাল মাটির সোঁদা গন্ধে মেতেছে বীরভূম। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা মানেই বাঙালির এক আবেগের উৎসব। তবে আজকের এই বিপুল জনসমাগমের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ এক ইতিহাস (History)। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী অনুযায়ী, ১৮৪৫ সালের ৭ পৌষ গোরিটির বাগানে প্রথম বসেছিল এই মেলা। তার প্রায় ১৭ বছর পর শান্তিনিকেতনের সেই নিঃসঙ্গ ছাতিম গাছের তলায় মহর্ষির কল্পনার শান্তিনিকেতন প্রকৃত রূপ পেতে শুরু করে।

রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়ায় সর্বজনীন রূপ শুরুতে পৌষমেলার আয়োজন ছিল প্রধানত দীক্ষিত ব্রাহ্মদের নিয়ে। মন্দির প্রতিষ্ঠার দিনে তখন মেলার চল ছিল না। ১৮৯৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরেই মেলার ধরনে পরিবর্তন আসে। মন্দিরের চতুর্থ বার্ষিক প্রতিষ্ঠা দিবসে তিনি মেলায় ‘দীনদুঃখীদের অন্ন ও বস্ত্র দান’ করার উদ্যোগ নেন। প্রথম তিন বছর এই উৎসব ধর্মীয় (Religious) গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথ এটিকে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত করেন। ১৯১৬ সালে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখা এক চিঠিতে কবি জানিয়েছিলেন, শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে তিনি বিশ্বের সঙ্গে ভারতের মেলবন্ধনের সূত্র (Link) করে তুলতে চান।

স্মৃতির পাতায় মেলার সেই ভিড় আজকের মেলার আধুনিক ভিড় দেখলে হয়তো অবাক হতে হয়, কিন্তু সেই আমলেও জনসমাগম নেহাত কম ছিল না। রবীন্দ্রনাথ একবার রাণু মুখোপাধ্যায়কে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, তাদের মেলায় অন্তত দশ হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল। বিশ্বভারতীর উজ্জ্বল প্রাক্তনী প্রমথনাথ বিশীর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে রায়পুরের রবিসিংহের কথা, যিনি সেই সময়কার অসম্ভব ভিড় সামলানোর মূল কারিগর (Director) ছিলেন।

মেলার বিবর্তন ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা তৎকালীন নথিপত্র এবং ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেলার নিজস্ব চরিত্র গড়ে উঠতে শুরু করে ১৮৯৬ সাল থেকে। শুরুর দিকে মেলায় মূলত দোকান-পসরা এবং জনসমাগমের (Public gathering) খবরই মুখ্য ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ৭ পৌষের ধর্মীয় আচার ছাপিয়ে এটি হয়ে ওঠে উদার ও সর্বজনীন।

Advertisement

মজার বিষয় হলো, আশ্রমের শুরুর যুগে কন্যারা মেলায় যাওয়ার অনুমতি পেতেন না। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলির লেখা থেকে জানা যায়, অনেক পরে আশ্রমের শিক্ষক ও গুণীজনদের পরিবারের মহিলারা মেলা দেখার সুযোগ পান। মুজতবা আলি তো চেয়েছিলেন এই মেলা উপলক্ষে দেশ-বিদেশের পণ্ডিত ও সাধকদের নিয়ে একটি তিনদিন ব্যাপী চিন্তাবিনিময় বা সেমিনারের (Symposium) আয়োজন হোক।

ঘরের মাঝে বাহিরকে আহ্বান রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মেলাই হলো এমন এক জায়গা যেখানে ‘বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান’ করা যায়। পৌষমেলার ঘরোয়া আনন্দ আর ছোট ছোট সুখ-দুঃখের গল্পগুলোই কবির কলমে বারবার উঠে এসেছে। আজও সেই একই ছন্দে শান্তিনিকেতনে ভিড় জমান অগুনতি মানুষ। মেলার মাঠের সেই হস্তশিল্প, বাউলের সুর আর ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে আজও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন বীরভূমের এই পবিত্র প্রাঙ্গণে।

পৌষমেলা কেবল একটি কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং বিশ্বমানবের মিলনের এক অনন্য মঞ্চ (Platform)।

Advertisement

Dwip Narayan Chakraborty is a dedicated journalist, digital content creator, and web strategist at Bengal Xpress. With a strong background in web design, digital marketing, and news media, he crafts compelling regional and national stories that inform, engage, and inspire. Dwip brings a unique blend of technical expertise and editorial vision, ensuring Bengal Xpress remains at the forefront of digital journalism in West Bengal. When he's not writing or managing the site, he's exploring new tools to innovate online news delivery.

Continue Reading
Advertisement