দেশের খবর
ভারত এখন চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি, তবে কেন বেকারত্ব কমছে না?
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের উত্থান ঘটলেও সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের বৈষম্য ঘোচেনি। প্রযুক্তির দাপট ও রাজনৈতিক কৌশলের ভিড়ে দিশেহারা তরুণ প্রজন্ম।
ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে (Fourth largest economy) উন্নীত হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রতিফলন নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। একদিকে জিডিপি-র (GDP) ঝকঝকে পরিসংখ্যান, অন্যদিকে রাজপথে তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের চোখেমুখে গভীর হতাশা—এই দুই বৈপরীত্যই বর্তমান ভারতের অর্থনৈতিক চিত্রের আসল বাস্তব।
কর্মসংস্থানের সংকট ও দক্ষতার বিবর্তন
ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে প্রথাগত কর্মসংস্থানের সুযোগ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে উচ্চ দক্ষতার (High skills) চাহিদা বাড়ছে, অথচ সেই তুলনায় কম দক্ষতার কাজগুলো সংকুচিত হচ্ছে। ফলে শ্রমবাজারে এক বিশাল বৈষম্য (Labor market inequality) তৈরি হচ্ছে। এছাড়া গত দশকে নিয়মিত বেতনভোগী ও স্বনিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রকৃত আয় (Real income) হয় স্থির রয়েছে অথবা হ্রাস পেয়েছে। বেকারত্বের তালিকায় সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা।
ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ডেটা সায়েন্স (Data Science), সাইবার সিকিউরিটি এবং ডিজিটাল মার্কেটিং-এর মতো আধুনিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন জরুরি। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই কোর্সগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল (Expensive), যা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। এখানে সরকারি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (Vocational training institutes) বড় ভূমিকা নেওয়ার কথা থাকলেও, আধুনিক উপকরণের অভাবে সেগুলো বর্তমানে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলছে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ ও রাজনীতির টানাপোড়েন
উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার জন্য মাথাপিছু গড় সরকারি ব্যয় যেখানে ৫৩,৪০০ টাকা, ভারতে সেই পরিমাণ মাত্র ৭,৪০৫ টাকা। অর্থাৎ ‘উন্নত ভারত’ (Viktisit Bharat) গড়তে হলে এই খাতে বিনিয়োগ সাত গুণ বাড়ানো প্রয়োজন। অথচ দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক নগদ প্রকল্পের (Populist schemes) মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ সরকারি অর্থ বিলি করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বিভিন্ন রাজ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা মহিলানিধি প্রকল্পের মতো স্কিমগুলোতে প্রায় ১.৫৫ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
এই বিশাল অর্থ মূলত শিক্ষকদের বেতন বা মাসিক অনুদান মেটাতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে, ফলে রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য বা শিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো মূলধনী ব্যয়ে (Capital expenditure) কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এই আর্থিক শৃঙ্খলাহীনতার (Fiscal indiscipline) ফলে রাজ্যগুলো বিপুল ঋণের কবলে পড়ছে এবং রাজস্ব ঘাটতি (Revenue deficit) বাড়ছে।
উত্তরণের পথ
এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে চারটি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি: ১. রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যগুলোতে কেন্দ্রীয় তহবিল বরাদ্দ। ২. একটি সুনির্দিষ্ট মধ্যমেয়াদি ব্যয়-কাঠামো (Medium-term expenditure framework) মেনে বাজেট প্রণয়ন। ৩. বাজেট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ৪. বাজেট তৈরির প্রাথমিক স্তরেই মূল অংশীদারদের মতামত নেওয়া।
পরিশেষে, বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো কেবল ক্ষমতাসীনদের শক্তি বাড়াচ্ছে এবং সীমিত মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করছে। সাধারণ নাগরিকদের কল্যাণে এই আয়কে কাজে লাগাতে হলে সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
