আন্তর্জাতিক
হাদি-মৃত্যুর পর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ সর্বত্র, রাজধানী ঢাকায় রাতভর তাণ্ডব
হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ হিংসা। সংবাদপত্রের অফিস, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দপ্তরে হামলায় উত্তাল পদ্মাপার।
ঢাকা: রোষ, ঘৃণা ও প্রতিশোধের আগুনে ফের জ্বলছে বাংলাদেশ। ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার রাতভর রাজধানী ঢাকা (Dhaka) সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নেমে আসে ভয়াবহ তাণ্ডব। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ (Arson), লুটতরাজের শিকার হয়েছে সংবাদপত্রের অফিস থেকে শুরু করে সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রও। রেহাই পায়নি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ (Chhayanaut)। ফের ভাঙচুর চালানো হয় ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির ধ্বংসাবশেষে।
শুক্রবার সকালে এই তাণ্ডবের ছবি ও ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে – এ কোন ‘সোনার বাংলা’? গত বছরের জুলাই আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনার পতনের পর একাধিকবার উগ্র কট্টরপন্থীদের হামলার ছবি সামনে এসেছে। সামনের বছর জাতীয় নির্বাচন (National Election) ঘোষণার পর যখন মনে করা হচ্ছিল পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হচ্ছে, তখনই ফের অশান্তির আগুনে পুড়ছে পদ্মাপার।
হাদির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর থেকেই ঢাকা, চট্টগ্রাম (Chattogram), রাজশাহি (Rajshahi), খুলনা (Khulna) সহ একাধিক শহরে একযোগে ছড়িয়ে পড়ে হিংসা। যেভাবে ঠান্ডা মাথায় দীর্ঘ সময় ধরে হামলা, লুটতরাজ চালানো হয়েছে এবং সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে- এই হিংসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হল কেন আইন -শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী? কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের (Interim Government) একাংশের ‘পরোক্ষ মদত’-এর অভিযোগও তুলেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus) বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে হাদির মৃত্যুর খবর ঘোষণা, এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং নাগরিকদের সহনশীল থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু তার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর তরফে ধারাবাহিক হুঁশিয়ারি, ভারত- বিদ্বেষী (Anti-India) স্লোগান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছিল। অভিযোগ, সেই উত্তেজনা প্রশমনের বদলে অন্তর্বর্তী সরকার বারবার ভারতের দিকেই আঙুল তুলেছে।
ঢাকায় হামলাকারীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ‘প্রথম আলো’ (Prothom Alo), ‘ডেলি স্টার’ (The Daily Star)-এর অফিসে হামলা, লুট ও অগ্নিসংযোগের জেরে শুক্রবার এই দুই সংবাদপত্র প্রকাশ করা যায়নি। ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের বাড়ির ধ্বংসাবশেষে ফের হামলা চালানো হয়। ঢাকার বাইরে ভারতীয় দূতাবাস (Indian Mission), আওয়ামি লিগের দপ্তর ও নেতাদের বাড়িও হামলার নিশানায় আসে।
রাজশাহিতে আওয়ামি লিগের মহানগর দপ্তর এক্সকাভেটর (Excavator) দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বান্দরবানে প্রাক্তন মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংহের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ ও ‘উদীচী’-র দপ্তরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সনজীদা খাতুনের ছবি ভাঙচুর করে তাঁকে ‘নাস্তিক’ বলে স্লোগান দেয় হামলাকারীরা।
চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার রাজীব রঞ্জনের বাসভবনে হামলার সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বিক্ষোভকারীরা। ঘটনায় এক হামলাকারী ও একাধিক পুলিশকর্মী গুরুতর আহত হন। ১২ জনকে আটক করা হয়েছে।
এই হিংসার মধ্যেই ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক সংখ্যালঘু যুবককে পিটিয়ে খুন করে পরে দেহ জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। খুলনায় অনলাইন সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হলেও পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে হাদি-পরবর্তী বিক্ষোভের সরাসরি যোগ নেই।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইউনূস এক বিবৃতিতে ‘বিচ্ছিন্ন উগ্র গোষ্ঠীর সহিংসতার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার’ আহ্বান জানান। তবে বিএনপি (BNP) সম্পূর্ণভাবে এই হিংসার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চাপিয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মুখে এমন পরিস্থিতি একেবারেই অনভিপ্রেত।
এদিকে সদ্য পদত্যাগী উপদেষ্টা মাহফুজ আলম দাবি করেছেন, ওসমান হাদির আততায়ীকে ভারত ফেরত না দিলে কূটনৈতিক সম্পর্ক (Diplomatic Relations) ছিন্ন করা উচিত। তাঁর মন্তব্য—“ভারত আমাদের শত্রু দেশ, তারা যদি আমাদের ঘুম কেড়ে নেয়, আমরাও ওদের ঘুমোতে দেব না”—নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
