আন্তর্জাতিক
এপার বাংলা জলপাইগুড়ির ‘বিউটি’ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গল্প
জলপাইগুড়ির নয়াবস্তিতেই কেটেছিল তাঁর শৈশব। পাড়ার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন আদরের ‘বিউটি’ বা ‘পুতুল’। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আজ স্মৃতিতে বুঁদ তাঁর জন্মভিটের বাসিন্দারা।
মঙ্গলবার সকালে খালেদা জিয়ার প্রয়াণের খবর আসতেই জলপাইগুড়ি শহরের নয়াবস্তি পাড়ায় নেমে আসে নিস্তব্ধতা। এই শহরের ধুলোমাখা পথেই কেটেছে তাঁর শৈশব। পাড়ার লোকজনের কাছে তিনি বাংলাদেশের হাই-প্রোফাইল নেত্রী নন, বরং ঘরের মেয়ে ‘বিউটি’ বা ‘পুতুল’। তাঁর মৃত্যুর খবরে আজ চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না নয়াবস্তির প্রবীণ বাসিন্দারা।
নয়াবস্তির মন্ডল পরিবার ও বিউটির বন্ধুত্ব
জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি পাড়ার মন্ডল পরিবারের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক (Intimate Relationship) ছিল খালেদা জিয়ার। ডাকবিভাগের কর্মী অজিত মন্ডলের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকেই থাকতেন খালেদার বাবা মহম্মদ ইসকন্দর মজুমদার। বিউটি ও অজিতবাবুর বোন শিয়ন মন্ডল ছিলেন সমবয়সী এবং প্রাণের বন্ধু। ছোটবেলায় সুনীতি বালা সদর গার্লস স্কুলে (School) একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন তাঁরা। মন্ডল বাড়ির মেজবউ বিজন বালা মন্ডলের কোলেই কার্যত বড় হয়েছেন ‘পুতুল’।
অজিতবাবুর ছেলে ভোলা মন্ডল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘দিদি আর বিউটিদি ছিল গলায় গলায় বন্ধু। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও সেই সম্পর্কে চিড় ধরেনি। মাঝেমধ্যেই ফোনে কথা হতো।’ যদিও পরে শিয়ন মন্ডলের মৃত্যু এবং ওপার বাংলার রাজনৈতিক ডামাডোলে (Political Unrest) যোগাযোগ কিছুটা ফিকে হয়ে গিয়েছিল।
চা-বাগানের শহর থেকে ক্ষমতার অলিন্দে
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জলপাইগুড়িতেই জন্ম খালেদার। তাঁর বাবা মহম্মদ ইসকন্দর মজুমদার ছিলেন ‘দাশ অ্যান্ড কোম্পানি’ ব্যাঙ্কের কর্মী। চা-বাগানের শেয়ার কেনাবেচার সূত্রে শহরের অভিজাত মহলে তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি ছিল। দেশভাগের (Partition) পর ১৯৫৪ সালে সম্পত্তির বিনিময়ের মাধ্যমে তাঁরা সপরিবারে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান।
১৯৬০ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর তাঁর নাম বদলে হয় বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু জলপাইগুড়ির মানুষের কাছে তিনি রয়ে গিয়েছেন সেই ছোট্ট বিউটিই। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের (Indo-Pak War) সময় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে থাকলেও, পরে বাংলাদেশে ফিরে চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন।
অমলিন নাড়ির টান
নয়াবস্তির মানুষের কাছে খালেদা জিয়া এক গর্বের নাম। জলপাইগুড়ির ইতিহাসবিদ (Historian) উমেশ শর্মার কথায়, ‘এই শহরের মাটি ও জল গায়ে মেখে বড় হওয়া একজন মেয়ে প্রতিবেশী দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বসেছেন, এটা জলপাইগুড়ির মানুষের কাছে চিরকালই গর্বের বিষয় ছিল।’
রাজনীতির দীর্ঘ লড়াই এবং চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি কয়েকবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু জন্মভিটের প্রতি টান কোনোদিন ভোলেননি। বছর কয়েক আগে একবার গোপনে এসে নিজের সেই পুরনো বাড়িও দেখে গিয়েছিলেন তিনি। আজ তাঁর প্রয়াণের খবরে সেই পুরনো স্মৃতিগুলোই বারবার ভিড় করে আসছে নয়াবস্তির প্রতিটি মোড়ে। প্রিয় ‘বিউটি-দি’র চলে যাওয়া যেন এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
