কল্পবিজ্ঞান এবার বাস্তবে! ৪,০০০ কিমি দূরে চিনে বসে হায়দরাবাদে রোগীর সফল অস্ত্রোপচার করলেন ভারতীয় চিকিৎসক
৪,০০০ কিমি দূর থেকে রোবটের মাধ্যমে সফল অপারেশন! চিনের উহানে বসে হায়দরাবাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর দেহে নিখুঁত অস্ত্রোপচার করলেন ভারতীয় সার্জন ডা. গাউস।
শল্যচিকিৎসক (Surgeon) সশরীরে উপস্থিত নেই অপারেশন থিয়েটারে (Operation Theatre)। তিনি বসে আছেন ভারত থেকে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে, চিনের উহানের একটি হাসপাতালে। অথচ তাঁর হাতের ইশারায় ভারতের হায়দরাবাদের হাসপাতালে শুয়ে থাকা রোগীর শরীরে নিখুঁত অস্ত্রোপচার চালিয়ে যাচ্ছে একটি রোবট (Robot)! কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হলেও, সম্প্রতি এমনই এক অবিশ্বাস্য এবং ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী থাকল ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থা।
গত ১৮ মে হায়দরাবাদের ‘এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ নেফ্রোলজি অ্যান্ড ইউরোলজি’ (AINU)-র রোবোটিক সার্জন ডা. সৈয়দ মহম্মদ গাউস এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন। তিনি তখন শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিলেন চিনের উহানের তংজি (Tongji) হাসপাতালে। সেখান থেকেই হাই-স্পিড ইন্টারনেটের সাহায্যে হায়দরাবাদে চিকিৎসাধীন এক রোগীর ‘রোবোটিক ইউরেটেরিক রিইমপ্লান্ট’ (Robotic Ureteric Reimplant) অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করেন তিনি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘টেলিসার্জারি’ (Telesurgery)।
দূরত্বের বাধা ঘুচিয়ে রিয়েল-টাইম অপারেশন
দূরত্ব ভুলে রিয়েল-টাইমে (Real-time) এই সফল অস্ত্রোপচারের অভিজ্ঞতা ভাগ করে চিকিৎসক গাউস জানান, সাধারণ ওটি-তে যেভাবে অপারেশন করা হয়, দূর থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিল ঠিক একই রকম। মূলত তিনটি প্রধান অংশের সমন্বয়ে এই রোবোটিক সার্জারি সিস্টেম (Robotic Surgery System) কাজ করে:
১. পেশেন্ট কার্ট (Patient Cart): যা সরাসরি রোগীর শরীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ২. イ্মেজ কার্ট (Image Cart): যা অস্ত্রোপচারের ভিতরের দৃশ্য প্রসেস (Process) করে পর্দায় ফুটিয়ে তোলে। ৩. সার্জনস কনসোল (Surgeon’s Console): যেখান থেকে চিকিৎসকরা রোবটের হাতগুলো নিয়ন্ত্রণ (Control) করেন।
চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ রোবোটিক সার্জারির সময়েও সার্জনরা রোগীর উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকেন না, বরং ওটি-র এক কোণে থাকা কনসোলে বসেই কাজ করেন। এবার শুধু সেই কনসোলটির দূরত্ব কয়েক মিটার থেকে বেড়ে ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
দুই দেশের সমন্বয়ে মেডিকেল টিম
অপারেশন চলাকালীন প্রধান চিকিৎসক গাউস চিনে থাকলেও, হায়দরাবাদের ওটি-তে রোগীর পাশে সর্বক্ষণ উপস্থিত ছিল এক দক্ষ সহকারী সার্জনসহ গোটা মেডিকেল টিম (Medical Team)। দুই দেশের চিকিৎসকদের মধ্যে কোনো রকম বাধা ছাড়াই অবিরাম টু-ওয়ে অডিয়ো-ভিডিয়ো (Two-way audio-video) যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছিল। ফলে কখনওই মনে হয়নি সার্জন অন্য দেশে আছেন।
এই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারে ব্যবহার করা হয়েছিল চিনা মেডিকেল টেকনোলজি কোম্পানি ‘মাইক্রোপোর্ট’ (MicroPort)-এর তৈরি ‘মেডবট’ (MedBot) রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম। এই একই সিস্টেম বর্তমানে ভারতের AINU হাসপাতালেও উপলব্ধ। তবে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এই ধরনের রোবোটিক অস্ত্রোপচারের প্রধান চাবিকাঠি হলো হাই-স্পিড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি (Internet Connectivity)। ওটি-র লাইভ ভিজ্যুয়াল (Live Visuals) এবং রোবটের কমান্ডগুলো যাতে এক মিলিসেকেন্ডের জন্যও আটকে না যায়, তার জন্য ৩০ থেকে ৫০ Mbps ব্রডব্যান্ড স্পিডের (Broadband speed) প্রয়োজন হয়েছিল।
হঠাৎ ইন্টারনেট চলে গেলে কী হতো?
এমন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কার জবাবে তিনি আশ্বস্ত করে জানান, এই ধরনের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে একাধিক সুরক্ষাকবচ বা ব্যাকআপ (Backup) থাকে। হাসপাতালগুলো সাধারণত একসঙ্গে ২-৩টি লিজড ইন্টারনেট লাইন (Leased internet lines) ব্যবহার করে। ফলে একটি লাইন ডাউন হলে অন্যটি তৎক্ষণাৎ চালু হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও যদি সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সেক্ষেত্রে ওটি-তে থাকা সহকারী চিকিৎসকরা সেকেন্ডের মধ্যে রোবটের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন, যাতে রোগীর কোনো ক্ষতি না হয়।
Frequently Asked Questions
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Wow
0
Sad
0
Angry
0
Comments (0)