প্যাকেটজাত স্বাস্থ্যকর খাবার (Healthy food) কিংবা নামী ব্র্যান্ডের এনার্জি ড্রিংকস কিনে ভাবছেন তো শরীরের পুষ্টি হচ্ছে? সাম্প্রতিক একটি দেশজোড়া সমীক্ষা কিন্তু চোখ কপালে তোলার মতো এক ভয়ংকর তথ্য সামনে এনেছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে বিক্রি হওয়া প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের ৮০ শতাংশের বেশি পণ্যে উচ্চ মাত্রায় কৃত্রিম সুগন্ধি (Artificial flavours), রং এবং ক্ষতিকর চিনি বা সুইটনার ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরনের ‘আল্ট্রা-প্রসেসড’ (Ultra-processed) বা অতি-প্রসেসড খাবার খাওয়ার প্রবণতা দেশজুড়ে যেভাবে বাড়ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে পড়ছে শিশুরা।
যেভাবে ধরা পড়ল আসল সত্য কনজিউমার নিউট্রিশন প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথইন’ (TruthIn) এবং ‘ন্যাটফার্স্ট’ (NatFirst)-এর যৌথ উদ্যোগে এই বিশাল সমীক্ষাটি চালানো হয়েছে। বাজারে থাকা খাবারের আসল রূপ ধরতে দেশজুড়ে ২৩,০০০-এরও বেশি খাবার এবং পানীয় পণ্যের লেবেল স্ক্যান করা হয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের চেনা খাবার যেমন—বিস্কুট, ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল (Breakfast cereal), কোল্ড ড্রিংকস এবং ইনস্ট্যান্ট নুডলস-পাস্তার মতো পণ্যে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো সবচেয়ে বেশি মিলেছে। অথচ, অনেক সংস্থাই এগুলোকে 'স্বাস্থ্যকর' বলে চটকদার বিজ্ঞাপন (Advertisement) দিয়ে বাজারে বিক্রি করছে।
ফুড লেবেল বনাম গ্রাহকদের অসচেতনতা সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামীণ ও শহুরে উভয় পরিবারেই প্রসেসড খাবার কেনার খরচ মারাত্মক হারে বেড়েছে। ভারতের 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউট্রিশন' (NIN)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৫.৪% ক্রেতা কেনাকাটার সময় ফুড লেবেল (Food label) দেখেন। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৪.৭% মানুষ ভেতরের উপকরণের তালিকা বা ‘ইনগ্রেডিয়েন্টস লিস্ট’ (Ingredient list) খুঁটিয়ে পড়েন! সিংহভাগ মানুষই কেবল এক্সপায়ারি ডেট (Expiry date) এবং ব্র্যান্ডের নাম দেখেই জিনিস কিনে নেন, যার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে কোম্পানিগুলো।
স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মহামারী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা (Public health experts) সতর্ক করছেন যে, অতিরিক্ত নুন, চিনি, অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং কৃত্রিম রাসায়নিক থাকার কারণে এই খাবারগুলো সরাসরি স্থূলতা (Obesity), ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের (Heart disease) ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এমনকি দেশের 'ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫-২৬' (Economic Survey 2025–26)-তেও এই উদ্বেগের কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল।
বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞান পত্রিকা 'দ্য ল্যানসেট' (The Lancet)-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে ভারতে আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারের খুচরো বিক্রি (Retail sales) ছিল মাত্র ০.৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সালের মধ্যে লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলারে! আর এই সময়কালের মধ্যেই ভারতে স্থূলতার হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মূল্যায়ন ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে সংগৃহীত ডেটার ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-চালিত টুলের সাহায্যে ২৫টিরও বেশি ক্যাটাগরির খাবারের লেবেল পরীক্ষা করা হয়। এই মূল্যায়নে 'ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া' (FSSAI), 'ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ' (ICMR) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র নির্দেশিকাকে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গবেষকদের স্পষ্ট বক্তব্য, শুধু প্যাকেটের সামনের চটকদার দাবি বা ব্র্যান্ডের নাম দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। সুস্থ থাকতে পণ্য কেনার আগে প্যাকেটের উল্টো পিঠে থাকা উপকরণের তালিকা পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। কোন খাবারে কতটা কৃত্রিম উপাদান বা লুকানো চিনি আছে, তা না জেনে খাবার মুখে তোলা মানেই নিজের ও সন্তানের বিপদ ডেকে আনা।




Comments (0)
Login or Register to comment.