খেলা-ধূলা
বাংলার ফুটবলে আবারও নক্ষত্র পতন! প্রয়াত হলেন ময়দানের ‘শিল্পী’ সুরজিৎ সেনগুপ্ত

বেঙ্গল এক্সপ্রেস নিউজ: লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, বাপ্পি লাহিড়ীর প্রয়াণের শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আবারও ইন্দ্রপতন। প্রয়াত হলেন সাতের দশকের কিংবদন্তি ফুটবলার সুরজিৎ সেনগুপ্ত। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। গত ২২ জানুয়ারি প্রয়াত হয়েছিলেন ময়দানের আরেক কিংবদন্তি ফুটবলার ও কোচ সুভাষ ভৌমিক।
তাঁর মৃত্যুর ২৬ দিনের মাথায় বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলে আবারও নেমে এল শোকের ছায়া। একদা সতীর্থ সুভাষ ভৌমিকের মৃত্যুর পরের দিনই করোনা আক্রান্ত হয়ে বাইপাসের ধারে এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সুরজিৎ। গত ২৫ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে আজ দুপুর ১.৫৪ মিনিট নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভারতীয় ফুটবলের শৈল্পিক উইঙ্গার। কোভিডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। তার সঙ্গে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট ও প্রচন্ড কাশি। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় তাঁকে বাইপ্যাপ সাপোর্টে আইসিইউ-তে রাখা হয়। কিন্তু গত শুক্রবার সন্ধে পর্যন্ত তাঁর অবস্থা সঙ্কটজনক হলেও, মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু রাতে আচমকা অবনতি হয়। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছিল কৃত্রিম পদ্ধতিতে। এ অবস্থায় তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু জীবন যুদ্ধের লড়াই আর চালিয়ে যেতে পারলেন না। রেখে গেলেন স্ত্রী শ্যামলী সেনগুপ্ত ও পুত্র স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্তকে।
১৯৫১ সালের ৩০ অগস্ট হুগলির চুঁচুড়ায় সুরজিতের জন্ম হয়। ছোটবেলার কোচ অশ্বিনী বরাটের হাত ধরেই হুগলি জেলার ফুটবল থেকে উঠে এসেছিলেন সুরজিৎ। এরপর কলকাতা লিগের লোয়ার ডিভিশন ক্লাব রবার্ট হাডসনে প্রথম সই করেন। ১৯৭০ সালে সেখান থেকে খিদিরপুরে যান এই বাঙালি উইঙ্গার। সেখানে কোচ অচ্যুত্ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোচিংই তাঁকে পাল্টে দিয়েছিল। সেখানে এক বছর খেলার পর ১৯৭২ সালে সই করেন মোহনবাগানে। সবুজ মেরুনে দুই বছর খেলার পর ১৯৭৪ সালে যোগ দেন ইস্টবেঙ্গলে। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেখান থেকেই সুরজিৎ সেনগুপ্তের স্বপ্নের উত্থানের শুরু। এবং সাতের দশকে ময়দানের নায়ক হয়ে ওঠেন। টানা ছ’বছর খেলেছেন লাল-হলুদ জার্সিতে। ১৯৭৫ সালের শিল্ড ফাইনালে মোহনবাগানকে ৫ গোলে হারানোর ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে প্রথম গোল ছিল তাঁরই। ১৯৭৮ সালে তিনি ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক ছিলেন। মূলত তিনি ছিলেন উইংয়ের প্লেয়ার। উইং থেকে সতীর্থদের জন্য গোলের ঠিকানা লেখা পাস বাড়াতেন। দু’পায়ে জোরাল শট নিতে পারতেন। উইথ দ্য রান ড্রিবলে ছিলেন পারদর্শী। ফুটবল কেরিয়ার করেছেন অসংখ্য দর্শনীয় গোল। তাঁর দর্শনীয় গোল দেখার জন্য গ্যালারিতে ভিড় জমাতেন ফুটবলপাগল দর্শকরা। বেশ কয়েকবার কর্নার থেকেও গোল করেছিলেন। এ সব কারণেই তাঁকে ময়দানের শিল্পী ফুটবলার বলা হত।
১৯৮০ সালে ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে যোগ দেন মহমেডানে। এবং ওই বছর মহমেডানকে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন করেন। ১৯৮১ সালে আবার মোহনবাগানে ফেরেন। এবং তিন বছর সবুজ-মেরুন জার্সিতে খেলার পর ১৯৮৪ সালে ফুটবল থেকে অবসর নেন সুরজিৎ। কিন্তু বন্ধু সুভাষ ভৌমিকের অনুরোধে দু’বছর পর আবার অবসর ভেঙে জর্জ টেলিগ্রাফে সই করেন সুরজিৎ। সে বার জর্জ টেলিগ্রাফের কোচ হয়েছিলেন সুভাষ ভৌমিক। দিন ২৫ আগে সেই সুভাষ মারা গিয়েছেন। এবার তাঁরই এক সময়ের সতীর্থ সুরজিৎও চলে গেলেন। ভারতের সমস্ত টুর্নামেন্টেই সাফল্য পেয়েছেন। মহম্মদ হাবিব, শ্যাম থামা, সুভাষ ভৌমিকদের পাশে তিনিও হয়ে উঠেছিলেন ময়দানের তারকা।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত বাংলার হয়ে সন্তোষ ট্রফি খেলেছেন। ১৯৭৬ সালে সন্তোষজয়ী বাংলার অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ভেটেরেন্স ক্লাবের বিচারে বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছিলেন সুরজিৎ। ১৯৭৪ সালে এশিয়ান গেমসে জাতীয় দলের অভিষেক হয়। ১৯৭৯ পর্যন্ত টানা জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন তিনি। ফুটবলের পাশাপাশি লেখাপড়াতেও যথেষ্ট ভালো ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সঙ্গীতের প্রতি তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ ও ভালোবাসা ছিল। খুব ভালো গান গাইতে ও তবলা বাজাতে পারতেন। চাকরি করতেন স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায়। চাকরি থেকে ঐচ্ছিক অবসর নেওয়ার পর ২০০৩ সাল থেকে এক বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের ক্রীড়া ম্যাগাজিনের দায়িত্বে ছিলেন। বাংলার এই দিকপাল ফুটবলারের মৃত্যুতে বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তাঁর শোক বার্তায় বলেছেন, ‘নক্ষত্র ফুটবলার সুরজিৎ সেনগুপ্তের প্রয়াণে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি আজ কলকাতায়…