খেলাধুলা
সংসারের সর্বস্ব দিয়ে গড়া স্বপ্ন, আইপিএলে ১৪ কোটিতে ঝলমল কার্তিক শর্মা
নাইট শেল্টারে রাত কাটানো ছেলেটাই আজ আইপিএল নিলামে ১৪ কোটির তারকা। কার্তিক শর্মার সংগ্রাম আর পরিবারের নিঃশব্দ ত্যাগের অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি
আইপিএল ২০২৬ (IPL 2026 Auction) নিলামে ১৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকার দর উঠতেই রাতারাতি আলোয় উঠে এল এক নাম—কার্তিক শর্মা (Kartik Sharma)। বয়স মাত্র ১৯ বছর। কিন্তু এই বিপুল অঙ্কের আড়ালে রয়েছে অনাহার, নিঃশব্দ ত্যাগ আর বছরের পর বছর অপেক্ষার এক কঠিন সংগ্রাম। চেন্নাই সুপার কিংসের (Chennai Super Kings) নতুন এই তারকার গল্প কেবল ক্রিকেটের উত্থান নয়, বরং একটি পরিবারের লড়াইয়ের জীবন্ত দলিল।
রাজস্থানের ভরতপুর (Bharatpur) জেলার বাহনেরা (Bahnera) গ্রামের বাসিন্দা কার্তিক। নিলামের পর বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িতে ফেরেন। খিরনি ঘাটের আগরওয়াল ধর্মশালায় (Agarwal Dharamshala) তাঁকে সংবর্ধনা দেন স্থানীয় মানুষজন ও ভরতপুর জেলা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (Bharatpur District Cricket Association – BDCA) সদস্যরা। সেই গর্বের মুহূর্তেই চোখ ভিজে ওঠে বাবা মনোজ শর্মার (Manoj Sharma)। কারণ, এই সাফল্যের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে রয়েছে সীমাহীন ত্যাগ।
সংবাদসংস্থা আইএএনএস (IANS)-কে মনোজ জানান, তাঁর রোজগার ছিল অতি সামান্য। তবু ছেলে কার্তিককে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন থেকে একচুলও সরে আসেননি তিনি ও তাঁর স্ত্রী রাধা দেবী (Radha Devi)। সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে বাহনেরার গ্রামে বিক্রি করতে হয়েছে চাষের জমি। সংসারের প্রয়োজনে নয়—ছেলের ভবিষ্যতের জন্য। রাধা দেবী নিঃশব্দে বিক্রি করেছেন নিজের সাধের গয়না। পরিবারের সব সঞ্চয় উজাড় করে দেওয়া হয়েছিল একটাই বিশ্বাসে।
সবচেয়ে কঠিন সময় আসে গ্বালিয়র (Gwalior)-এ এক টুর্নামেন্ট চলাকালীন। বাবা-ছেলে ভেবেছিলেন, চার-পাঁচ ম্যাচেই হয়তো যাত্রা শেষ হবে। সেই ক’দিনের থাকা-খাওয়ার টাকাই ছিল তাঁদের সম্বল। কিন্তু কার্তিকের ব্যাট থামেনি। দল পৌঁছে যায় ফাইনালে। টাকার অভাবে রাত কাটাতে হয় নাইট শেল্টারে (Night Shelter)। একদিন না খেয়েই ঘুমোতে হয়েছিল তাঁদের। ফাইনাল জিতে প্রাইজমানি (Prize Money) পাওয়ার পরই বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা হয়।
কার্তিকের প্রতিভা ধরা পড়ে খুব ছোট বয়সেই। আড়াই বছর বয়সে ব্যাট হাতে এমন জোরে বল মারেন যে বাড়ির দুটি ফটোফ্রেম ভেঙে যায়। তখনই মনোজ বুঝে যান—এই ছেলে আলাদা। নিজেও একসময় ক্রিকেট খেলতেন তিনি। চোটের কারণে থেমে যায় তাঁর স্বপ্ন। তাই ছেলের মধ্যেই নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণের সংকল্প নেন।
তবে প্রতিভা থাকলেই পথ মসৃণ হয় না। অনূর্ধ্ব-১৪ (Under-14) ও অনূর্ধ্ব-১৬ (Under-16) খেলার পর টানা চার বছর কোনও দলে সুযোগ পাননি কার্তিক। অনেকেই তখন হাল ছেড়ে দিত। তিনি দেননি। বাবাই ছিলেন তাঁর কোচ (Coach)। প্রতিদিন নিজে হাতে ট্রেনিং করাতেন।
অবশেষে আসে অনূর্ধ্ব-১৯ (Under-19) দলে সুযোগ। সেখান থেকে রঞ্জি ট্রফি (Ranji Trophy)। আর সেখান থেকেই খুলে যায় আইপিএলের দরজা।
হঠাৎ বিপুল অর্থ আর পরিচিতি পেলেও পা মাটিতেই রাখতে চান কার্তিক। সদ্য দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করেছেন তিনি। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও স্পষ্ট। ছোট ভাই ক্রিকেট খেলে, মেজো ভাই পড়াশোনায় মন দিয়েছে—পরিবারে ভারসাম্যই তাঁদের মূল শিক্ষা।
মায়ের গয়না বিক্রি, বাবার অনাহার—আজ সেই ত্যাগেরই মূল্য মিলেছে ১৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকায়। কার্তিক শর্মার গল্প তাই শুধু আইপিএলের নয়, বরং হাজারো ছোট শহরের স্বপ্ন দেখার সাহসের প্রতীক।
